কার কাছে ফতওয়া চাইব?

প্রবন্ধটি “আল উসুল মিন ইলম আল-উসুল”-এর উপর উস্তায যাইন আল-আবিদিন আল–হাম্বলির দরসের আলোকে রমিয আবিদের নেওয়া নোট অবলম্বনে লেখা হয়েছে।]

ফতওয়া হচ্ছে কোনো ইস্যুতে কাউকে আল্লাহ্‌র শারই হুকুম জানানো। যিনি অন্যদের এই হুকুম সম্পর্কে অবহিত করেন, তিনি হচ্ছে মুফতি। আর যিনি ফতওয়ার জন্যে জিজ্ঞেস করেন, তিনি হচ্ছেন মুস্তাফি অথবা ফতওয়াপ্রার্থী।

যাদের কাছে ফতওয়া চাওয়া যেতে পারেঃ

১। মুজতাহিদ মুতলাকঃ সাধারণভাবে শুধুমাত্র মুজতাহিদ মুতলাক ফতওয়া দিতে পারে, এটা হাম্বলি মাযহাবের মূল মত। ইনারা হচ্ছে মূলত সেসকল ব্যক্তি যারা সরাসরি শরিয়তের উৎস [যেমন, কুরআন সুন্নাহ] থেকে মাস’আলা বের কত্যে পারেন এবং তাদের জন্যে অন্য কারও তাকলিদ করা জায়েজ নয়।

দৃষ্টান্তঃ চার ইমামগণ। এই পর্যায়ের সর্বশেষ জানা আলিম হচ্ছেন শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া। মাযহাবের বেশিরভাগ আলিমের মতে তিনি মুজতাহিদ, তবে কেউ কেউ দ্বিমত করেছেন।

২। মুজতাহিদ ফিল মাযহাবঃ যখন কোনো মুজতাহিদ মুতলাক না থাকে, তখন মুজতাহিদ ফিল মাযহাবের ফতওয়া জায়েজ, কেননা এটা যরুরিয়তের মধ্যে পড়ে।

তারা সরাসরি কুর’আন এবং সুন্নাহ থেকে মাস’আলা উদ্ভুত না করে মাযহাবের ইমামের বক্তব্যগুলোকে নিরীক্ষা করবে।

এদের মধ্যে চার ধরণ রয়েছেঃ

ক) যারা মাযহাবের ইমামের দলিল এবং ফতওয়ায় মুকাল্লিদ নন, তারা ইজতিহাদ এবং ফতওয়ায় ইমামের ন্যায় আচরণ করে। তবে তারা মানুষদের মাযহাবের দিকে ডাকে, তারা মাযহাবের মতসমূহ অধিক সত্য এবং যোগ্য মনে করে, তারা ইমামের নিকট থেকে অনেক পড়েছেন এবং তাঁর সাথে ও তাঁর পদ্ধতি/উসুলের সাথে শক্তভাবে একমত পোষণ করে।

দৃষ্টান্তঃ ইমাম আহমদের কিছু সরাসরি ছাত্র, যেমন ইমাম আবু দাউদ আল-সিজিস্তানি।

এই প্রকারটি মুজতাহিদ মুতলাকের সবচেয়ে/খুব কাছাকাছি।

খ) যারা ইমামের মাযহাবের মুকাল্লিদ তবে তারা ইমামের বক্তব্যের পেছনে দলিল পেশ করতে পারে। তাছাড়াও, তারা ফিকহ, কিয়াস, ইমামের উসুলে দক্ষ হবার পরও ইমামের উসুলের বাইরে যান না।

দৃষ্টান্তঃ আবি ইয়ালা, ইবনে আকিল, ইবনে কুদামাহ।

গ) এই পর্যায়ের ইমামরা আগের দুই পর্যায়ের চেয়ে নিচে, তবে তারা মাযহাবের ফিকহে فقيه النفس বা ফকিহুল নাফস, বহুদিন ধরে ফিকহের সাথে সংশ্লিষ্টতার ফলে। তাদের এছাড়াও নিম্নোক্ত গুণ রয়েছেঃ

  • ১। তারা ফুকাহাদের ভাষার [সঠিক] ব্যবহার করে।
  • ২। তারা ইমামের মাযহাবকে সংরক্ষণ করে।
  • ৩। তারা মাযহাবের দলিল সম্পর্কে অবগত।
  • ৪। তারা ইমামের মাযহাব বর্ণনা করে এবং সাপোর্ট করে।
  • ৫। তারা মাযহাবের উসুলের পরিমার্জনা করে।
  • ৬। তারা মাযহাবের উসুল থেকে উদ্ভুত করে।
  • ৭। তারা মাযহাবকে ডিফেন্ড করে।

এই ইমামগণ আগের দুই পর্যায়ের থেকে নিচের কোনো একটি কারণে-

  • ১। তাদের মাযহাবের সংরক্ষণ পূর্ববর্তী পর্যায়গুলোর সমকক্ষ নয়।
  • ২। তারা উসুলুল ফিকহের বেশি গভীরে যাননি।

দৃষ্টান্তঃ ইবনে মুফলিহ, মজদউদ্দিন ইবনে তাইমিয়া।

ঘ) এই পর্যায়ের ইমামরা মাযহাবকে সংরক্ষণ করে, বর্ণনা করে এবং মাযহাবকে অনুধাবন করে। বর্তমানের বেশিরভাগ মুফতি এই পর্যায়ে পড়েন। তাদের মধ্যে নিম্নোক্ত গুণাবলি রয়েছেঃ

  • ১। তারা মাযহাবকে মানুষের নিকট বর্ণনা করে।
  • ২। তাদের মাযহাবের ইস্যু/মাস’আলায় সুক্ষভাবে দক্ষতা রয়েছে। (মানে হচ্ছে তারা এগুলো ভালোভাবে বুঝে এবং সঠিকভাবে বর্ণনা করে)
  • ৩। তাদের প্রশ্ন-জিজ্ঞেসকারী বা ফতওয়াপ্রার্থীর অবস্থা ও পরিস্থিতি বুঝে উত্তর দেবার সক্ষমতা রয়েছে।
  • ৪। তাদের বর্ণনা এবং ফতওয়ায় ভরসা করা হয়– আর এতে তাদের ভিত্তি হচ্ছে মাযহাবের লেখা, ইমামের পরিস্কার বক্তব্য এবং মাযহাবের বড় অনুসরণকারী ইমামরা, যারা ইমামের মূলনীতি অনুসরণ করে মাস’আলা উদ্ভুত করেছেন। এই চতুর্থ পর্যায়ের আলিমদের জন্যে অন্য পদ্ধতি অনুসরণ বা নিজস্ব ফতওয়া দেওয়া জায়েজ নেই।

যদি তারা এমন কোনো ইস্যুর মুখোমুখি হয় যেখানে তাদের মাযহাবে কোনো মাস’আলা নেই, তাহলে এটা নিম্নের তিনটি ক্ষেত্র হতে পারেঃ

  • এক. তারা মাযহাবে এমন কোনো ইস্যুর ব্যাপারে বক্তব্য খুঁজে পায়, যেটা তেমন বেশি একটা চিন্তা না করেই তারা বুঝতে পারে যে নতুন ইস্যুর অনুরুপ। ফলে, তারা একই হুকুম/ফতওয়া আরোপ করেন।
  • দুই. তারা মাযহাবে কোনো সাধারণ মূলনীতি খুঁজে পান যেটার ব্যাপারে তারা নিশ্চিতভাবে জানেন যে এর মধ্যে নতুন ইস্যুও অন্তর্ভুক্ত। ফলে তারা সেভাবে হুকুম আরোপ করেন।
  • তিন. তারা মাযহাবে কোনো [অনুরুপ বা সামঞ্জস্যপূর্ণ] বক্তব্য বা মূলনীতি খুঁজে পান না, ফলে তারা ফতওয়া দেওয়া থেকে দূরে থাকবে এবং বলবে, “আমি জানি না”।

আর সার্বিকভাবে এই দুই-দল [মুজতাহিদ মুতলাক এবং মুজতাহিদ মুকাইয়াদ] বাদে অন্যদের ফতওয়া দেওয়া জায়েজ নেই, একইভাবে অন্যদের নিকট ফতওয়াপ্রার্থীর ফতওয়া চাওয়াও জায়েজ নেই।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *