পূর্ববর্তীহাম্বলিউলামা-১

বাগদাদ, শাম, মিশর এবং শেষে আরব উপদ্বীপে হাম্বলি মাযহাবের অনেক বিখ্যাত ইমাম এসেছেন। নিচে ইমাম আহমদের ছাত্র থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত কিছু আলিমের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলঃ

(ব্র্যাকেটে মৃত্যুসাল)

আল-খাল্লাল (৩১১)– ইমাম আহমদের নিকটস্থ কিছু সাথী এবং ছাত্রের ছাত্র হচ্ছেন ইমাম আল-খাল্লাল। তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব হলো বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ইমাম আহমদের বিভিন্ন ছাত্রের নিকট থেকে ইমাম আহমদের মাসাইল সংগ্রহ করা।

গুলাম আল-খাল্লাল (৩৬৩)– ইমাম খাল্লালের খাদেম এবং নিবেদিত ছাত্র। ইলমের শাখায় বিভিন্ন লেখা লিখেছেন। বর্ণিত হয়েছে, মৃত্যুর পূর্বে অসুস্থ থাকা অবস্থায় তিনি সাথিদের বলেছেনঃ “আমি এই শুক্রবার পর্যন্ত তোমাদের সাথে আছি।” যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয় “কেন”, তিনি বলেন, আল-খাল্লাল আবু বকর মাররুযি থেকে বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমদ ৭৮ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এবং শুক্রবারে মারা যান। আবু বকর আল-মাররুযি ৭৮ বছর বেঁচে ছিলেন এবং শুক্রবারে মারা যান। আল-খাল্লাল ৭৮ বছর বেঁচে ছিলেন এবং শুক্রবারে মারা যান। এরপর গুলাম আল-খাল্লালও শুক্রবারে ৭৮ বছর বয়সে মারা যান।

ইবনে হামিদ (৪০৩)- তিনি তাঁর সময়ের হাম্বলি ফিকহের একজন সামনের সারির ইমাম ছিলেন। প্রায়ই হজ করার জন্যে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন, তাঁর মৃত্যুও হয় মক্কা থেকে ফিরবার সময়ে। তাকে হাম্বলিদের প্রথম তবাকার শেষ ইমাম গণ্য করা হয়।

কাযি আবু ইয়ালা (৪৫৮)– তিনি হানাফি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, কিন্তু পরে ইবনে হামিদের অধীনে অধ্যয়নের পর হাম্বলি হন। তিনি ইবনে হামিদের পর মাযহাবের সামনের সারির কর্তৃত্বশীল ইমাম ছিলেন। ইমাম আহমদের মাযহাব দূর-দুরান্তে ছড়িয়ে দেবার জন্যে তিনি খ্যাত। তাঁর হাদিসের মজলিশগুলো বেশ জনপ্রিয় ছিল এবং হাজারো মানুষ অংশ নিত। কাযি আবু ইয়ালা আবদুল্লাহ বিন আহমদ বিন হাম্বলের চেয়ারে বসে হাদিস বর্ণনা করতেন।

আবু আল-খাত্তাব (৫১০)– কাযি আবু ইয়ালার একনিষ্ঠ ছাত্র এবং মাযহাবের বহু গ্রন্থের রচয়িতা। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রচনা হচ্ছে “আল-ইনতিসার”, এখানে তিনি হাম্বলি ফিকহের মতগুলোর পক্ষে আলোচনা করেছেন। হাম্বলিদের বিভিন্ন বিখ্যাত ইমাম তাঁর ছাত্র ছিল, যেমন আব্দুল কাদির আল-জিলানি।

আবু ইসমাইল আল-হারাউই (৪৮১)– একজন খাতিমান হাম্বলি ফকিহ এবং ইমাম, বিস্ময়কর ব্যক্তিত্ব এবং আশআরিদের বিরুদ্ধে থাকার জন্যে পরিচিত। তিনি ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত সুফি ইমাম, উনার বিখ্যাত তাসাউফের রচনা হচ্ছে “মানাযিল আস-সায়িরিন” (ইমাম ইবনে কায়্যিম এর বিখ্যাত ব্যাখ্যা “মাদারিজ আস-সালিকিন” লিখেন)। তিনি হাম্বলি আকিদার জোরালো সমর্থক ছিলেন, বলতেন-“হাম্বলি আমি- যতক্ষণ বেঁচে আছি, এবং যখন মারা যাবমানুষের প্রতি আমার অসিয়ত হচ্ছে হাম্বলি হওয়া।”

আবুল ওয়াফা আলি ইবনে আকিল (৪৮৮)- হাম্বলিদের ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ফকিহ। তরুণ বয়সে তিনি মুতাযিলা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং হাল্লাজের প্রশংসা করতেন, কিন্তু দ্রুত তিনি তওবা করেন এবং মুতাযিলা ও আশআরিদের রদ করে রচনা করেন। ইবনুল জাওযি বর্ণনা করেছেন, ইবনে আকিল একবার বলেছিলেন- “আমি সম্পূর্ণ নিশ্চয়তার সাথে বলছি, সাহাবিগণ [রা] জাওহার এবং আরাধের ব্যাপারে কোনো জ্ঞান ছাড়াই মৃত্যুবরণ করেন। তাই তোমার যদি মনে হয় তাদের মত হওয়া উচিৎ, তাহলে হও! কিন্তু তোমার যদি মনে হয় কালামের চিকিৎসকেদের পদ্ধতি আবু বকর এবং উমর (রা) এর পদ্ধতি থেকে উত্তম, তাহলে কত খারাপ এই চিন্তা।” তিনি অনেকগুলো রচনা করেছেন, তাঁর মধ্যে একটি হচ্ছে “আল-ফুনুন”, যার একটি অংশ আজ পাওয়া যায়।

আব্দুল কাদির আল-জিলানি (৫৬১)– বিখ্যাত হাম্বলি তাত্ত্বিক এবং সম্ভবত সবচেয়ে প্রভাবশালী সুফি ব্যক্তিত্ব, কাদিরিয়া তরিকার প্রতিষ্ঠাতা।

ইবনুল জাওযি (৫৯৭)- বিখ্যাত ফকিহ, মুফাসসির, সমলোচক, দাঈ এবং প্রাণবন্ত লেখক – ইবনুল জাওযি রহিমাহুল্লাহ। প্রায় সব বিষয়ে তাঁর রচনা রয়েছে। ইমাম আহমদ নিয়ে বিখ্যাত “মানাকিবু ইমাম আহমদ” রচনা করেন। অনেক কম বয়সে তিনি মানুষকে আল্লাহ্‌র দিকে ডাকতেন এবং জনমানুষের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তিনি ইবনে আকিলের রচনা দ্বারা কিছুটা প্রভাবিত হন এবং হাম্বলিদের আকিদা থেকে কিছু স্থানে ভিন্নমত পোষণ করেন। পরবর্তী হাম্বলি আলিম, যেমন, ইবনে কুদামাহ রহিমাহুল্লাহ তাঁর আকিদার কাজগুলোর সমলচনা করেছেন।

ইবনে কুদামাহ (৬২০)ঃ হাম্বলিদের অন্যতম ইমাম এবং শাইখুল মাযহাব উপাধিধারি- ইবনে কুদামাহ রহিমাহুল্লাহ। তাঁর রচিত ফিকহে গ্রন্থ “আল-মুগনি” ফিকহের ইতিহাসে অন্যতম সেরা গ্রন্থ, অন্য মাযহাবের আলেমগণও এটা থেকে উপকৃত হন। তিনি হাম্বলি আকিদা শক্তভাবে ধারণ করেন এবং আশআরিদের বিরোধিতা করেন। তবে এটা তাকে কুদসে ক্রসেডারদের বিরুদ্ধে সালাহউদ্দিন আইয়ুবির সমরবাহিনীতে যোগদানের পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *