মুতাআখ্‌খিরীন হাম্বালীগণ কীভাবে মু’তামাদে পৌঁছেছেন? মু’তামাদের বাইরে ফাতওয়া দেবার বিধান কী?


ইমাম ‘আলাউদ্দীন আল মারদাওয়ী রহিমাহুল্লাহ তার আল ইনসাফ কিতাবের মুকাদ্দিমাতে বলেন:

লক্ষ্যণীয়: জেনে নাও! আল্লাহ তোমাকে ও আমাদের তাওফীক দিন, এই কিতাবে আমার অনুসৃত পদ্ধতি হচ্ছে ইমাম আহমাদ ও আসহাব থেকে উদ্ধৃতি প্রদান। আমি যেকোন কিতাব থেকে যা উদ্ধৃত করি তার রেফারেন্স দেই এবং যেকোন আলেম থেকে যা বর্ণনা করি তা তার প্রতি যুক্ত করি।

  • যদি মাযহাব প্রকাশ্য কিংবা প্রখ্যাত হয় কিংবা আসহাবের অধিকাংশই যদি একে গ্রহণ করে থাকে, তবে এতে কোন ইশকাল-সন্দেহ নেই, যদিও আসহাবের কেউ কেউ মাযহাবকে এর বিপরীত বলে দাবি করে।
  • কিন্তু তারজীহ প্রদানের ক্ষেত্রে আসহাব অবিচ্ছিন্ন উৎসবিশিষ্ট মাসআলাসমূহে ইখতিলাফ করেন, তবে মাযহাব জানার ক্ষেত্রে মু’তামাদ হচ্ছে যা বলেছেন – গ্রন্থকার (ইবন কুদামা), আল মাজদ, ব্যাখ্যাকার (ইবন আবি উমার), আল ফুরু’ রচয়িতা (ইবন মুফলিহ), আল কাওওয়াঈদুল ফিকহিয়্যা রচয়িতা (ইবন রজব), আল ওয়াজীয রচয়িতা (আদ দুজায়লী), আর রি’আয়াতাইন রচয়িতা (ইবন হামদান), আন নাযম রচয়িতা (ইবন আব্দিল ক্বাউই), আল খুলাসাহ রচয়িতা (আব্দুল আযীয বিন আবিল ইয আল মাকদিসী), শায়খ তাকিউদ্দীন (ইবন তায়মিয়্যাহ) এবং তাযকিরাহতে ইবন ‘আবদূস। কেননা তারা পূর্ববর্তীদের কথাগুলো সুবিন্যস্ত করেছেন এবং সুনিশ্চিতভাবে মাযহাবের নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন।
  • যদি তাদের মাঝে ইখতিলাফ হয়, তবে মাযহাব হচ্ছে যা আল ফুরু রচয়িতা (ইবন মুফলিহ) তার অধিকাংশ মাসআলাসমূহে যেটি এগিয়ে রেখেছেন।
  • কিন্তু তিনি যদি “ইখতিলাফ রয়েছে” শব্দ প্রয়োগ করেন কিংবা এটি যদি তার এগিয়ে রাখা মাসআলাসমূহের বাইরে হয়, তবে মাযহাব হচ্ছে তাই যাতে একমত হয়েছেন শায়খাইন তথা গ্রন্থকার (ইবন কুদামা) এবং আল মাজদ কিংবা একজন অন্যজনের ইখতিয়ারের সাথে একমত হয়েছেন।
  • কিন্তু এটি নিঃশর্তভাবে নয়, বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রে। যদি উভয়ের ইখতিলাফ হয়, তাহলে মাযহাব হচ্ছে তাই যার সাথে একমত হয়েছেন আল কাওয়াঈদুল ফিকহিয়্যা রচয়িতা (ইবন রজব) কিংবা শায়খ তাকিউদ্দীন (ইবন তায়মিয়্যাহ)।
  • অন্যথায় (অর্থাৎ দুইজনের সাথে একমত না হলে) মাযহাব হচ্ছে যা বলেছেন গ্রন্থকার (ইবন কুদামা) বিশেষ করে তার “আল কাফী”তে। এরপর আল মাজদ। আল্লামা ইবন রজব তার তাবাকাত গ্রন্থে ইবনুল মুনা এর জীবনীর অধীনে উল্লেখ করেন: “আমাদের সমকালীনগণ এবং তাদের পূর্বেও ফিকহের বিষয়ে কিতাব ও শায়খের ক্ষেত্রে আল মুওয়াফ্‌ফাক (ইবন কুদামা) এবং আল মাজদের নিকট প্রত্যাবর্তন করে থাকেন।”
  • যদি এই দুইয়ের কারোই বিশুদ্ধ মত নির্ধারণ না থাকে, তবে আল কাওয়াঈদ আল ফিকহিয়্যা রচয়িতা (ইবন রজব), অতঃপর আল ওয়াজীয রচয়িতা (আদ দুজায়লী), অতঃপর আর রি’আয়াতাইন রচয়িতা (ইবন হামদান), অতঃপর রি’আতাইনের মাঝে ইখতিলাফ হলে আল কুবরা, অতঃপর আন নাযম রচয়িতা (ইবন আব্দিল ক্বাউই), অতঃপর আল খুলাসাহ রচয়িতা (আব্দুল আযীয বিন আবিল ইয আল মাকদিসী), অতঃপর ইবন আবদূসের তাযকিরা, অতঃপর যারা এরপরে।

সম্ভব হলে আমি কে এগিয়ে রেখেছেন কিংবা বিশুদ্ধ বলে নির্ধারণ করেছেন কিংবা গ্রহণ করেছেন, তা উল্লেখ করি। তবে এটি পরিমাণ অত্যল্প। আর এখানে আমি যা বলেছি তা হচ্ছে সামগ্রিকভাবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে। অন্যথায় সর্বক্ষেত্রে এটি অনুসৃত হয়, এমন নয়। কখনো একটি মাসআলায় একজন যা বলেন তা মাযহাব হয়, আর অন্য মাসআলায় অন্য একজন যা বলেন। এভাবে অন্যদের বেলাতেও। আর এটি করা হয় নুসুস, দলীল-প্রমাণ ও এর প্রতি আসহাবের সহমত থেকে। আর এটা হচ্ছে যা আমার কাছে তাদের কথা থেকে প্রকাশ্যমান হয়েছে। আর যারা তাদের বক্তব্যগুলো অনুসন্ধান করে ও জানতে পারে, তার কাছেও প্রকাশ্যমান হবে। আমি বেশ কিছু স্থানে এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষন করব। বলা হয়ে থাকে, ইখতিলাফের ক্ষেত্রে তারজীহ হচ্ছে যা বলেছেন শায়খাইন (ইবন কুদামা ও আল মাজদ)। যদি আল মুকনি’ (ইবন কুদামার লেখা) ও আল মুহাররারে (আল মাজদের লেখা) দ্বিমত থাকে, তবে মাযহাব হচ্ছে যা (ইবন কুদামা) বলেছেন আল কাফীতে। শায়খ তাকিউদ্দীনকে (ইবন তায়মিয়্যাহ) আল কাফী (ইবন কুদামা), আল মুহাররার (আল মাজদ), আল মুকনি’ (ইবন কুদামা), আর রি’আয়াহ (ইবন হামদান), আল খুলাসাহ (আব্দুল আযীয ইবন আবিল ইয), আল হিদায়া (আবুল খাত্তাব) কিংবা অন্য গ্রন্থে যেসব মাসআলায় (তাসহীহ উল্লেখ ব্যতিরেকে) নিঃশর্তভাবে ইখতিলাফ উল্লেখ থাকে, সেক্ষেত্রে মাযহাব জানা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল।তিনি উত্তর দেন: “তালিবুল ইলমের জন্য এটি অন্য কিতাবাদী থেকে জেনে নেয়া সম্ভব। যেমন আল কাদ্বী (আবি ইয়ালা) এর তা’লীক্ব, আবুল খাত্তাব রচিত আল-ইন্তিসার, ইবন আকীলের উমাদুল আদিল্লাহ, কাযী ইয়াকুব বা আয যাগুনীর তা’লীক্বসহ বড় বড় গ্রন্থগুলো থেকে যাতে ইখতিলাফি মাসআলা উল্লেখ থাকে এবং রাজেহ মতটি উল্লেখ থাকে। আমি এই কিতাবগুলোকে কয়েকটি সংক্ষিপ্ত কিতাবে সংক্ষেপন করে এনেছি। যেমন: কাযী আবু ইয়া’লা, শরীফ আবু জা’ফর, আবুল খাত্তাব, কাযী আবুল হুসাইনের মৌলিক মাসআলাসমূহ। আমাদের দাদা আবুল বারাকাত (আল মাজদ) থেকে উদ্ধৃত আছে যে, তাকে মাযহাবের যাহের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন: আবুল খাত্তাব তার মৌলিক মাসআলাসমূহে যাকে তারজীহ দিয়েছেন।এছাড়াও এটি জানা যায় আবু মুহাম্মাদ (আল মুওয়াফ্‌ফাক ইবন কুদামা) এর আল মুগনী এবং আমাদের দাদার (আল মাজদ) শারহুল হিদায়াহ থেকে। আর যারা ইমাম আহমাদের উসুল ও নুসুস সম্পর্কে অবগত আছে, সে সাধারণভাবে মাসআলাগুলোতে তার মাযহাবে রাজেহ মত জেনে নিতে পারবে।” শায়খ তাকিউদ্দীন (ইবন তায়মিয়্যাহ) এর কথা সমাপ্ত। আর এটি আমরা প্রথমে যা বলেছি, তার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এই আলোচনার কিছু কিতাবুল কাদ্বা এর শেষের দিকে আসবে। জেনে নাও! আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন। আসহাবের মাঝে যখন ইখতিলাফ হয়, এটি দুই দিক থেকেই দলীল শক্তিশালী হওয়ার কারণেই কেবল হয়ে থাকে। আর এই কথাগুলো যারা বলেছেন তারা প্রত্যেকেই অনুসরনযোগ্য ইমাম। সুতরাং তার কথা অনুযায়ী তাকলীদ ও আমল করা বৈধ। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এটি তার ইমামের মাযহাব হয়ে থাকে। কেননা ইখতিলাফ যদি স্বয়ং ইমাম আহমাদ নিজেই করেন, তাহলে তো স্পষ্ট। আর যদি তা আসহাবের মধ্যকার হয়, তবে একে ইমাম আহমাদের নীতিমালা এবং তার উসুল ও নুসুসের উপর কিয়াস করা হবে। আর এটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (ইমাম আহমাদ থেকে) নিশ্চিত প্রমাণিত কোন দিক/বর্ণনা অনুযায়ী ফাতওয়া দেয়া জায়েয। আর আল্লাহ সুবহানাহু তা’আলাই অধিক অবগত। [ইমাম আল মারদাওয়ী; আল ইনসাফ, ১/১৬-১৮] জ্ঞাতব্য বিষয়: আলাউদ্দীন আল মারদাওয়ীর মাধ্যমে হাম্বালীদের মুতাআখখিরীনের যুগ সূচনা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি পরবর্তী হাম্বালীদের প্রথম ইমাম। তিনি যেই কিতাবগুলো উল্লেখ করেছেন সেগুলো মধ্যবর্তীদের শেষের দিককার। অপরদিকে শায়খুল ইসলাম ইবন তায়মিয়্যাহ (৬৬৩-৭২৮ হি.) হচ্ছে মধ্যবর্তী হাম্বালীদের (৪০৩-৮৮৪ হি.) ইমাম। তিনি যেই কিতাবগুলো উল্লেখ করেছেন তা মধ্যবর্তী হাম্বালীদের প্রথম দিককার। উল্লেখ্য মধ্যবর্তী হাম্বালীদের প্রথম ইমাম হচ্ছেন কাযী আবু ইয়া’লা। শরীফ আবু জা’ফর তার সমকালীন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *